21/12/2023
খোদা নিজেই কিছু মানুষের সন্ধান করেন
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
অনেকেই খোদার সন্ধান করেন, খোদাকে পেতে চান, তবে এ কথা অনেকেই জানেন না যে, খোদা নিজেই অনেক মানুষকে পেতে চান, কেউ হয়তো বলতে পারেন, সেটা আবার কেমন কথা। আসলে এটা আমার কথা নয় বরং কোরানের কথা। আসলে খোদা অনেক মানুষকেই মনোনীত করেন, তার বন্ধু হবার জন্য। তিনি যখন কাউকে মনোনীত বা পছন্দ করেন, তখন তিনি তার মনোনীত একজন হাদি নিযুক্ত করেন ঐ পছন্দের ব্যক্তিকে সিরাতুল মুস্তাকিমের পথ দেখাবার জন্য। যেমনঃ পবিত্র কোরানের ঘোষণা -
"মাই ইয়াহ্ দিয়াল্লাহু ফাহুয়াল মুহ্তাদি ওয়া মাই ইয়ুদলিলহু ফালান তাজিদাহু অলিয়্যাম মুর্শিদা"
অর্থাৎ আল্লাহপাক যাকে মনোনীত করেন, তার জন্য তিনি একজন হাদি নিযুক্ত করেন, এবং যাকে গোমড়া করেন বা পথ দেখাতে চান না, তার জন্য থাকে না কোনো মনোনীত সাহায্যকারী অলি ও বন্ধুরূপে কোনো মুর্শিদ।
সুরাঃ কাহাফ, আয়াত-১৭
যেমনঃ বিশ্বপ্রসিদ্ধ মাওলানা জালালুদ্দীন রুমি কখনই তার পীর হযরত শামস তাবরিজের সন্ধান করেননি, বরং শামস তাবরিজই হঠাৎ এসে মাওলানা রুমির সামনে এসে উপস্থিত হন, তখন রুমি তার কিছু মূল্যবান কেতাব খুলে গবেষণার কাজে ব্যস্ত ছিলেন, শামস দেখে বললেন, ওহে এগুলো কি? আর তুমিই বা কি করছো? রুমি বললেন, ওহে ফকির! তুমি এসবের কি বুঝবে? তোমার তো এ বিষয়ে কোনো জ্ঞানই নাই। একথা শোনার পর শামস রুমির সমস্ত কেতাবগুলো কুয়ার পানিতে ফেলে দেন। এর পরের ঘটনা সবারই জানা।
মাওলানা রুমির জন্য মহান আল্লাহপাক যাকে মনোনীত হাদিরূপে পাঠিয়েছিলেন অলি ও মুর্শিদ হিসেবে তিনিই হযরত খাজা শামস তাবরিজ (রহ.)।
মাওলানা রুমি তার সময়ের জগদ্বিখ্যাত আলেমে দ্বীন তথা সর্বোচ্চ ধর্মীয় পণ্ডিত হওয়া সত্ত্বেও একজন মজ্জুব ফকিরের কাছে অসহায় হয়ে পড়েন। তার কেতাবী জ্ঞান ও এলেমের অহঙ্কার চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায় শামস তাবরিজের সামান্য আঙুলের ইশারাতেই। রুমি তাজ্জব বনে যান, একজন আগন্তুকের হাতের ইশারায় কি করে কুয়ায় ফেলে দেওয়া কেতাবগুলো যথাস্থানে পূর্বের অবস্থায় রয়ে গেল, তিনি আরও বেশী তাজ্জব বনে গেলেন, তখন দেখলেন তার কেতাবগুলোতে জলপর্যন্ত স্পর্শ করেনি। কেতাব কুয়ায় ফেলে দেওয়ার রাগের পরিবর্তে বরং তিনি দরবেশের কেরামতি নিয়ে ভাবতে লাগলেন, মনের অজান্তেই বলে ফেললেন, "হে আগন্তুক! এটা আবার কেমন জ্ঞান যে কেতাবগুলো জলে ফেলে দিলেন আর ইশারায় তুলে আনলেন, তাতে জলের বিন্দুকণাও স্পর্শ করল না।"
আগন্তুক বললেন, "আমি যখন শুধালাম, এসব কেতাব তোমার কি কাজে আসবে? তুমি বলেছিলে এসব মহামূল্যবান কেতাবের তুমি কি বুঝবে? আমি বিরক্ত মনে করে কেতাবগুলো জলে নিক্ষেপ করলাম। আর যখন তোমার ভীষণ আফসোস হলো, তখন আমি আঙুলের ইশারায় সবগুলো কেতাব তুলে আনলাম যাতে জলের স্পর্শ না লাগে। তুমি আমার এই বিদ্যা দেখে অবাক হয়ে বললে, এটা আবার কেমন জ্ঞান?
আমি বলি, তুমি এই জ্ঞানের যোগ্য নও, তুমিও এ জ্ঞানের কিছুই বুঝবে না, তোমার সকল জ্ঞান তো কেতাবের পাতায় বন্দী! যাকে জলে ফেলে দেওয়া যায়, আগুনে নিক্ষেপ করা যায়, জলে ভিজলে, আগুনে পুড়লেই তোমার কেরামতি শেষ, এমন বিদ্যা নিয়ে তোমার কিসের অহঙ্কার? ওহে মাওলানা! যে জ্ঞান অহঙ্কার উৎপাদন করে, সে জ্ঞান খোদার সন্ধান দিতে পারে না, যে বিনয় ও ভক্তি উৎপাদন করে নিজেকে সমর্পিত করে, সমস্ত অহমিকা চূর্ণ-বিচূর্ণ করে সে জ্ঞান খোদার নৈকট্য লাভের উপযুক্ত করে তোলে। তুমি জানো না, সুরা কাহাফের ঘটনা, মুসা জাদরেল নবী হয়েও মজ্জুব খিজিরের কাছে এই জ্ঞান লাভের জন্য আল্লাহপাক পাঠালেন, মুসা ধৈর্যের পরীক্ষায় পাশ করলেন না, কারণ তার ঐ জ্ঞানের অভাব ছিল, অবশেষে আল্লাহপাক দয়াপরবশ হয়ে মুসাকে সে জ্ঞান শিখিয়ে দিলেন, মুসা এক ভিন্ন মুসায় পরিণত হলো, তার মর্যাদা ও শান বেড়ে গেল। "
এরপর মজ্জুব শামস তাবরিজ বললেন, "হে মাওলানা! তুমি কি খোদাকে চাও, নাকি কেতাব চাও, কেতাব চাইলে নাও, তোমার সকল কেতাব ও সঞ্চিত বিদ্যা অক্ষত আছে, ইতোপূর্বে যা তোমার অহঙ্কার ও গর্বের কারণ ছিল। কিন্তু যদি খোদাকে চাও, আর এই জ্ঞান তাহলে আমার পিছু নাও, দরবেশীই তোমার নিশানা হবে। "
রুমি কেতাবী জ্ঞান দ্বারা আল্লাহকে তালাশ করছিলেন দীর্ঘ সময় ধরে। তিনি বুঝতে পারলেন, কেতাবী জ্ঞান বা বিদ্যা দ্বারা আল্লাহকে পাওয়া যায় না। আল্লাহকে পেতে হলে একজন গুরু বা মুর্শিদের প্রয়োজন। আর সেই মুর্শিদ তার সম্মুখে হাজির হয়েছেন আল্লাহপাকের মনোনীত হাদিরূপে।
মাওলানা রুমি জানতেন না যে, আল্লাহপাক তাকে মনোনীত করেছেন, অথচ তিনি কেতাবী বিধানে দীর্ঘ সময় ধরে আল্লাহপাকের সন্ধান করছেন। আসলে কেতাবী জ্ঞান আল্লাহপাকের বিধি-বিধান, হুকুম, আহকাম সম্পর্কে জানতে সহায়ক হলেও আল্লাহকে পাওয়ার জ্ঞান সম্পূর্ণ ভিন্ন। সে জ্ঞান লাভের জন্য একজন মুর্শিদের প্রয়োজন, যা আল্লাহর ঘোষিত উপরোক্ত আয়াতে বর্ণিত হয়েছে।
এরপর রুমি মাওলানার খেতাব বর্জন করে কেতাবী বিদ্যার অহঙ্কার চূর্ণ-বিচূর্ণ করে মজ্জুব শামস তাবরিজের পিছু পিছু ছুটলেন। রুমি হয়ে গেলেন পৃথিবীর অন্যতম সেরা দরবেশ ও সুফিদের একজন।