28/08/2026
সেদিন এক আপু বলছিল, “আমাকে সব সামলানো লাগে, আপু। মানে, করতেই হবে। কোনো অপশন নাই।”
কথাটা এমনভাবে বলা, যেন এটা কোনো অভিযোগও না। জীবনের একটা fact মাত্র। সূর্য পূর্ব দিকে ওঠে, পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে, আর সংসারে কিছু কিছু মহিলা সব সামলায়। কারণ তাদের সামলাতেই হবে। না সামলালে কী হবে, সেটা কেউ জানে না। সম্ভবত পৃথিবী তার axis থেকে সরে যাবে।
বাংলাদেশি সমাজে একজন নারীর জন্য একটা unofficial checklist আছে মনে হয়। মজার ব্যাপার হলো, সেটা কোথাও লেখা নেই, কিন্তু মোটামুটি সবাই জানে কোন কাজগুলো তার করার কথা। সংসার, সন্তান, চাকরি, আত্মীয়তা, সামাজিকতা—সব জায়গাতেই তার একটু একটু করে দায়িত্ব আছে। আর কোনো একটা জায়গায় একটু এদিক-সেদিক হলেই আশপাশ থেকে খুব আন্তরিকভাবে মনে করিয়ে দেওয়ার মানুষেরও অভাব হয় না।
মেয়ে বিয়ে করার আগে তাকে বলা হবে, “নিজের পায়ে দাঁড়াও। মেয়েদের financially independent হওয়া খুব জরুরি।” সে চাকরি শুরু করলে বলা হবে, “টাকা কামানোই কি সব? সংসারটাও তো দেখতে হবে।” চাকরি ছেড়ে সংসার দেখলে কিছুদিন পরই প্রশ্ন আসবে, “এত পড়াশোনা করে লাভ কী হলো তাহলে?”
অর্থাৎ নারীকে financially independent হতে হবে, কিন্তু তার financial independence-এর কারণে বাসার কারও চায়ের সময় যেন পাঁচ মিনিটও এদিক-সেদিক না হয়। অফিসে professional, বাসায় ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে full-time homemaker। Corporate meeting চলাকালীন স্কুল থেকে ফোন এলে meeting ছেড়ে দৌড়াবে, কিন্তু অফিসে performance কমলে motherhood কোনো excuse না। আবার বাসায় ফিরলে office-এর tiredness কোনো excuse না। নারী একই সঙ্গে working woman আর stay-at-home mother-এর সমস্ত service পরিবারকে দেবে—এই হচ্ছে basic package।
তারপর বাচ্চা হলে শুরু হবে Motherhood Olympics.
বাচ্চা চিকন—“মা খাওয়ায় না?”
বাচ্চা মোটা—“এত খাওয়াও কেন?”
বাচ্চা অসুস্থ-"ঠিক করে দেখে রাখ নাই কেন?"
বাচ্চা চুপচাপ—“সারাদিন মোবাইল দেখে মনে হয়।”
বাচ্চা দৌড়াদৌড়ি করে—“মা কোনো discipline শেখায় নাই?”
বাচ্চা ইংরেজিতে ভালো—“বাংলা শেখাও নাই?”
বাংলায় ভালো—“English-এর দিকে একটু নজর দেওয়া দরকার।”
বাচ্চা পরীক্ষায় ৯৮ পেল—বাকি দুই নম্বর কোথায় গেল, সেটা নিয়ে মোটামুটি judicial inquiry বসে যাবে। আর ৭৫ পেলে তো মা সরাসরি প্রধান আসামি। বাসার বাকি মানুষজন এই মামলায় concerned citizen-এর ভূমিকা পালন করে মাঝেমধ্যে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবেন এবং প্রয়োজনীয় প্রশ্ন তুলবেন—“ওর পড়াশোনাটা একটু দেখো না কেন?”
মা তখন ভাববে, গত তিন ঘণ্টা যে অঙ্কের খাতা নিয়ে বসে ছিলাম, ও ক্যায়া মেরা hallucination থা?
এরপর আছে ঘর। ঘর সবসময় এমন পরিষ্কার থাকতে হবে যেন এখানে কোনো মানুষ বসবাস করে না। অথচ সেই ঘরেই কয়েকজন মানুষ সারাদিন স্বাভাবিক নিয়মে জিনিসপত্র ছড়িয়ে যাবে। সোফার উপর মোজা, ডাইনিং টেবিলে স্কুলব্যাগ, বাথরুমে ভেজা তোয়ালে, বিছানায় বিস্কুটের গুঁড়া—সবকিছু যেন mysteriously নিজে নিজেই জন্ম নেয়। কিন্তু এত কিছুর মধ্যে সোফার একটা কুশন বাঁকা থেকে গেলে বা মেঝেতে দুটো খেলনা পড়ে থাকলে, কারও না কারও চোখে সেটা ঠিকই পড়বে—“আজকে বাসাটা গোছাও নাই নাকি?”
না ভাই। আজকে United Nations-এর peacekeeping mission-এ ছিলাম। এইমাত্র ফিরলাম।
রান্নার ব্যাপারটা আরও advanced। Healthy হতে হবে, tasty হতে হবে, বাচ্চারা খাবে এমন হতে হবে, সবাই পছন্দ করবে এমন হতে হবে, বাজেটের মধ্যে হতে হবে, প্রতিদিন একই জিনিস হওয়া যাবে না। আবার রান্নাঘরে বেশি সময় দিলে—“বাচ্চাদের সাথে quality time spend করব কখন।” বাচ্চাদের সাথে বসলে—“আজকে রান্না কখন করব?" কত চিন্তা মাথায় রাখা লাগে। @
সমাজের ধারণা, একজন মায়ের দিনে সম্ভবত ৪৭ ঘণ্টা থাকে।
এর মধ্যে নিজের শরীরটাও maintain করতে হবে। মা হওয়ার পর ক্লান্ত দেখালে—“নিজের একটু যত্ন নাও।” সাজগোজ করলে—“বাচ্চাকাচ্চা রেখে এত সাজের সময় পাও কই?” ওজন বাড়লে—“নিজের দিকে খেয়াল রাখো।” শরীরচর্চা করতে সময় বের করলে—“এই সময়টায় বাচ্চাদের সাথে থাকলেও তো পারতা।”
তারপর সবচেয়ে premium expectation—সবকিছু করতে হবে হাসিমুখে।
কাজ করলেই হবে না। বিরক্ত হওয়া যাবে না। ক্লান্ত হওয়া যাবে না। মাঝে মাঝে একা থাকতে ইচ্ছা করা যাবে না। বাচ্চার উপর ধৈর্য হারালে খারাপ মা, স্বামীর উপর বিরক্ত হলে খারাপ স্ত্রী, আত্মীয়ের অন্যায় কথার উত্তর দিলে বেয়াদব, উত্তর না দিয়ে দূরে সরে গেলে অহংকারী।
আর সাহায্য চাইলে তো bonus dialogue আছেই—
“আমাদের মায়েরা তো এত কিছু করেও কখনো complain করত না।”
আমাদের মায়েরা complain করত না, নাকি তাদের complaint শোনার মতো কেউ ছিল না—এই research-টা অবশ্য আজও pending।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, এই অসম্ভব checklist-এর শেষে সমাজ আবার খুব মায়া করে বলে, “নিজেকেও একটু সময় দিও।”
কখন ভাই?
সকাল থেকে নাস্তা, স্কুল, চাকরি, বাজার, রান্না, homework, laundry, family responsibility, আত্মীয়তার diplomacy, বাচ্চার emotional needs, সংসারের হাজারটা invisible কাজ—সব শেষ করে রাত ১২টা ৪৭ মিনিটে যে এগারো মিনিট বাকি থাকে, ওই সময়টায় কি self-care করব, skincare করব, বই পড়ব, exercise করব, নাকি ceiling-এর দিকে তাকিয়ে নিজের অস্তিত্ব নিয়ে ভাবব?
সমাজ আসলে নারীকে মানুষ হিসেবে খুব কমই কল্পনা করে। কল্পনা করে একটা highly efficient multifunctional device হিসেবে—যে income করবে, সন্তান মানুষ করবে, ঘর সামলাবে, সম্পর্ক বাঁচাবে, সবার birthday মনে রাখবে, সবার মন বুঝবে, নিজের মন নিজেই সামলাবে এবং এত কিছুর পরেও battery percentage দেখাবে ৮৭%।
তাই ওই আপুর “করতেই হবে, কোনো অপশন নাই” কথাটা মাথায় থেকে গেল।
কারণ অনেক নারীর সবচেয়ে বড় ক্লান্তি সম্ভবত কাজের পরিমাণ না। সবচেয়ে বড় ক্লান্তি হলো—তার ক্লান্ত হওয়ারও কোনো জায়গা নাই। সে জানে, আজকে তার শরীর খারাপ হলেও কিছু কাজ তার জন্য অপেক্ষা করবে। মন খারাপ হলেও করবে। কান্না পেলেও করবে। কারণ সে না করলে কে করবে—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করার দায়িত্বটাও শেষ পর্যন্ত তারই।
তারপর কোনো একদিন সে যদি খুব সাধারণভাবে বলে, “আমি আর পারতেছি না,” মানুষ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে—
“কেন? কী এমন করো সারাদিন?”
কিছুই না।
শুধু একটা পুরো সংসারের invisible operating system হয়ে বসে থাকি।
©️nnshejuti