29/09/2025
পরাধীনতার শৃঙ্খল কতটা ভয়ঙ্কর, তা স্বাধীন মানুষের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়। আকাশে ডানা মেলে উড়ে বেড়ানো মুক্ত পাখি কি কখনো বুঝতে পারবে খাঁচায় বন্দি পাখির কষ্ট, তার নিঃশ্বাসের চাপা হাহাকার? ঠিক তেমনি, যাদের জীবন স্বাধীনতার রঙে রঙিন, তারা কেমন করে বুঝবে আজন্ম পরাধীন মানুষের অসহায়ত্ব।
আমাদের সমাজে মেয়েদের জন্ম থেকেই যেন এক অদৃশ্য খাঁচায় বন্দি করে রাখা হয়। জন্মের পর থেকে বাবা-মায়ের অনুমতির বেড়াজাল, কৈশোরে আরও কঠোর নিয়মের শৃঙ্খল, আর বিবাহের পর তো পরাধীনতার আরেক নতুন অধ্যায়। তখন শুরু হয় স্বামী, শ্বশুর, শাশুড়ির অনুমতির অপেক্ষা। যেন নিজের জীবন নিজের হাতে নয়, অন্য কারো হাতে লেখা।
বিয়ের আগে একটি মেয়ের প্রতিটি ইচ্ছে, প্রতিটি চাওয়া-পাওয়ার জন্য বাবা-মায়ের দিকে তাকাতে হয়। ছোটখাটো আনন্দ, সাধ, স্বপ্ন—সবকিছুর জন্য হাত পাততে হয় তাদের কাছে। আর বিয়ের পরে সেই একই চাওয়া-পাওয়ার জন্য তাকাতে হয় স্বামীর দিকে। বাবা-মা যেমন মাঝে মাঝে ‘না’ বলে দেন, তেমনি স্বামীও বলেন। কিন্তু সব সময়ই যে সেই ‘না’-এর পিছনে যুক্তি থাকে, তা নয়। কখনো থাকে কেবল ক্ষমতার প্রকাশ, কখনো থাকে ইচ্ছার অভাব, আবার কখনো কেবল এই কারণে পাওয়া হয় না যে—তারা চাইলো না।
অনেক মেয়েরা আবার ঘর-সংসারের পাশাপাশি চাকরি করে, ঘাম ঝরিয়ে উপার্জন করে, পরিবারের জন্য নিজের সময় আর শক্তি বিলিয়ে দেয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, সেই উপার্জনের উপরও তাদের কোনো অধিকার থাকে না। যে টাকাটা তারা কষ্ট করে রোজগার করে, সেটার দিকেও স্বামী কিংবা শ্বশুরবাড়ির অন্য সদস্যরা কর্তৃত্ব দেখায়। তারা সিদ্ধান্ত নেয় সেই টাকার ব্যবহার নিয়ে, অথচ যিনি সেই শ্রম দিয়েছেন, তার কোনো মতামতকেই গুরুত্ব দেওয়া হয় না। যেন উপার্জনও স্বাধীনতা এনে দেয় না, বরং নতুন আরেক শৃঙ্খল যোগ করে দেয় জীবনে।
ফলে মেয়েদের জীবনটা যেন হয়ে দাঁড়ায় অনুমতির উপর নির্ভরশীল এক দীর্ঘ সংগ্রাম। ডানা থাকা সত্ত্বেও আকাশে উড়তে না পারা পাখির মতো, তারা প্রতিনিয়ত অনুভব করে অদৃশ্য শৃঙ্খলের চাপা যন্ত্রণা।
মেয়েরা নিজে থেকেও স্বপ্ন দেখতে জানে, সিদ্ধান্ত নিতে জানে, জীবন সাজাতে জানে। কিন্তু সমাজের চাপে, পারিবারিক কাঠামোর কারণে তাদের সেই অধিকারগুলো কেড়ে নেওয়া হয়। তাদের শক্তি, প্রতিভা, সাহস—সবকিছুই যেন খাঁচার ভেতরে আটকে রাখা হয়। অথচ তারা যদি স্বাধীনতার স্বাদ পেতো, হয়তো আরও উজ্জ্বল হতো, আরও দীপ্তিময় হতো তাদের জীবন।
প্রশ্ন একটাই থেকে যায়—কবে ভাঙবে এই শৃঙ্খল? কবে মিলবে সেই কাঙ্ক্ষিত মুক্তি? যে মুক্তি একজন মানুষকে মানুষ হিসেবে বাঁচার অধিকার দেয়।