26/11/2025
বড় লিখা অনেকেই এড়িয়ে যান কিন্তু কষ্ট করে পড়ুন অনেক কিছু শেখার আছে। শুভ সকাল।
প্রায় পনেরো বছর পর হঠাৎ একদিন হোটেলের লবিতে দেখা হয়ে গেল আমার এক পুরনো বন্ধুর সাথে। শৈশবের সেই মৃদুভাষী, ভদ্র, শান্ত ছেলেটি, যে খুব সাধারণ জীবন যাপন করত, আজও সেই আগের মতোই রয়ে গেছে। চেহারায় বিনয়ের ছাপ, পরনে সাধারণ পোশাক, চালচলনে নেই কোনো বাহুল্য।
কুশল বিনিময়ের পর আমি বললাম, "চল, তোকে আমার গাড়িতে করে বাড়ি পৌঁছে দেই।"
আসলে বন্ধুকে গাড়িতে তুলতে চাওয়ার পিছনে আমার একটা গোপন উদ্দেশ্য ছিল। আমার দামি মার্সিডিজ গাড়িটা ওকে দেখানো! বন্ধু দেখুক, আমি কত সফল, কত বড়লোক হয়েছি! কিন্তু সে বিনয়ের সাথে জানাল, “না, থাক, আমি আমার গাড়িতেই চলে যাব।”
পার্কিং লটে দুজন পাশাপাশি হেঁটে এলাম। বন্ধুর গাড়িটা একেবারেই সাধারণ। মনে মনে হাসলাম, ও এখনও এমন পুরোনো মডেলের গাড়ি চালায়!
সপ্তাহখানেক পরে ওকে ডিনারে আমন্ত্রণ জানালাম। ও পরিবার সহ এলো। ওর স্ত্রী, দুই সন্তান, সবাই এতটাই নম্র আর মার্জিত যে দেখে অবাক হলাম। সাজ-পোশাকে কোনো আড়ম্বর নেই, কিন্তু একটা প্রশান্তি, একটা শান্ত সৌন্দর্য লেগে আছে চোখেমুখে!
সেই রাতে কথার ফাঁকে ফাঁকে আমি বন্ধুকে বুঝিয়ে দিলাম আমার অভিজাত জীবন, দামি গাড়ি বাড়ি, আসবাবপত্র, আমার লাক্সারিয়াস লাইফ স্টাইল, অফিসের বিদেশ ভ্রমণ, লেটেস্ট ট্রেন্ড আর ফ্যাশনের প্রতি ঝোঁক, কত হাই ক্লাস লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ!
সত্যি কথা বলতে, আমি যেন আমার আভিজাত্য ওকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে চাইছিলাম। মোবাইলে একটার পর একটা ছবি দেখাচ্ছিলাম, গল্পের ফাঁকে ফাঁকে আমার অফিসের বিজনেস ডিলের প্রসঙ্গ তুলছিলাম।
কিন্তু ও যেন এসব নিয়ে খুব একটা উৎসাহী না। বরং ওর মুখে তখন অন্য এক আলো! শৈশবের স্কুল, পুরোনো বন্ধু, প্রিয় স্যারদের কথা, কতদিন কার খোঁজ নেওয়া হয় না, কতজন এখন আর বেঁচে নেই —এসব মনে করে ওর চোখের কোণে একটুখানি অশ্রুও দেখা গেল।
আমি বিরক্তি গোপন না করে বলেই ফেললাম, “শুধু পুরোনো স্মৃতি আর নীতিকথা মনে করে থাকলে জীবনে এগোনো যায় না!”
ডিনারের পরে ওরা চলে গেল। আমি ভাবলাম, এবার নিশ্চয় ও বুঝতে পারল, কে কতদূর এগিয়েছে!
কয়েক সপ্তাহ পর ফোন এলো বন্ধুর কাছ থেকে। বলল, "আগামীকাল দুপুরে ফ্রি আছো? সবাই মিলে আমার বাড়িতে বেড়াতে আসো।”
সেদিন আমার স্ত্রী আমার বাল্য বন্ধুটির ওপর বেশ বিরক্ত হয়েছিল। ওকে তাই অনেকটা জোর করে রাজি করিয়ে গেলাম বন্ধুর বাসায়।
গিয়ে দেখি, সবকিছু গোছানো, পরিপাটি, কিন্তু একদম সাধারণ। দামি আসবাব নেই, ঝকমকে কিছু নেই, তবু কি যে শান্ত আর আপন একটা পরিবেশ! যেন একটা মমতার ঘ্রাণ চারপাশে ভেসে বেড়াচ্ছে।
টেবিলের উপর চোখ পড়তেই দেখি, আমার কোম্পানির পাঠানো একটা সুন্দর গিফট বক্স!
আমি বিস্মিত হয়ে বললাম, “এই কোম্পানিতে তো আমি চাকরি করি! তুই এটা কোথায় পেলি?”
ও হেসে বলল, “ডেভিড পাঠিয়েছে।”
আমি থমকে গিয়ে বললাম, “কোন ডেভিড? ডেভিড থমসন?”
সে মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ, ডেভিড আমার পুরোনো বন্ধু। আমরা বহুদিন ধরেই আমরা একসাথে ব্যবসা করি।”
আমি যেন বিশ্বাস করতে পারছিলাম না! এই মানুষটাই আমাদের কোম্পানির ৭০% এর মালিক! যার নামে আমরা সম্মানে মাথা নিচু করি, সেই ডেভিড থমসনের পার্টনার — এই আমার সেই ছোটবেলার সাধারণ বন্ধু!
আমি যেন মুহূর্তেই ভেতরে ভেতরে খুব ছোট হয়ে গেলাম। যে মানুষটিকে আমি আমার দামি জিনিসপত্র দেখিয়ে মুগ্ধ করতে চেয়েছি, সে তো নিজেই আমার চাকরিদাতার বন্ধু। এমনকি কোম্পানির বেশিরভাগ মালিকানাও তার!
আমার অহংকার, দম্ভ, গর্ব সব যেন এক নিমেষে ধুলায় মিশে গেল। গাড়িতে ফিরে স্ত্রীর দিকে তাকালাম। দেখলাম, সেও চুপচাপ। আমাদের মুখে কোনো কথা নেই, কিন্তু মনের মধ্যে চলছে অনেক কিছু!
হঠাৎ মনে পড়ল আমাদের স্কুলের সেই প্রিয় স্যার বলতেন, "যে নদী যত গভীর, তার বয়ে চলার শব্দ তত কম।” আজ মর্মে মর্মে উপলব্ধি করলাম কথাটার মানে। যাদের হৃদয়, মানসিকতা আর আত্মবিশ্বাস গভীর, তারা কখনও বড় বড় কথা বলে না, বাহারি জিনিস দেখিয়ে বড় হওয়ার চেষ্টা করে না। তারা নীরবে বয়ে চলে, কিন্তু তাদের গভীরতায় সত্যিকারের আভিজাত্য প্রকাশ পায়।
CP