06/02/2025
#ব্রেস্টফিডিং চার বছর লাগাতার দুই বাচ্চাকে ব্রেস্টফিড/স্তন্যপান করিয়ে যা শিখলাম:
💜 আমাদের স্তন হলো বহমান নদী, লেক বা পুকুর না। নদী যেমন কখনো খালি করা যায় না, দুই বালতি পানি উঠালে আবার স্রোত এসে খালি জায়গা ভরে যায় আমাদের স্তনের ফ্লোও একই ভাবে কাজ করে। এটা কখনোই খালি হবে না, যত বেশী বাবু খাবে তত বেশী স্রোতের মত দুধ আসবে। যত ডিমান্ড তত সাপ্লাই। যদি স্তন কখনো খালি খালি লাগে তাহলে মনে রাখবেন শুধু স্তনে জমানো দুধ বাবু খেয়ে ফেলেছে, শরীর দুধ তৈরী করা বন্ধ করে নি, দুধ তৈরীর প্রক্রিয়া কখনই বন্ধ হয় না বাবু যতই খাক। বহমান নদীর মতন এটা চলমান প্রক্রিয়া। এজন্য নরম তুলতুলে স্তন স্বাভাবিক, তার মানে আপনার স্তন ভালোমতন রেগুলেট হচ্ছে। শক্ত চাকা হওয়া মানেই অনেক দুধ তা কিন্তু না, তার মানে তৈরী হওয়া দুধ জমাট হয়ে আছে খরচ হচ্ছে না, এতে নানান রকম জটিলতার সম্ভাবনা থাকে। আসলান যখন খুব ছোট ছিল তখন অল্প কিছুদিন আমার স্তন শক্ত হয়ে চাকা হয়ে থাকতো, যখন ও পুরোটা খেয়ে দুধ তৈরীর সাপ্লাই এ্যান্ড ডিমান্ডের প্রক্রিয়া সচল রেখেছে তার পর থেকে আমার কোনদিন লিকও হয় নি, স্তন শক্তও হয় নি, স্বাভাবিক অবস্থায় আছে। ঐযে বললাম আমাদের স্তন নদী, পুকুর নয় যে স্তনেই দুধ সংরক্ষিত থাকতে হবে।
💜 আমাদের দুধ তৈরী হয় রক্ত দিয়ে, আমরা যে খাবার খাই সেটা সরাসরি দুধে পরিনত হয় না। দেশে যে এটা খেও না ওটা খেও না বলে তার বেশীরভাগেরই কোন ভিত্তি নেই। আমরা কোন কিছু খাবার পরে সেটা পাকস্থলীতে যায়, সেটা ভেঙ্গে রক্তে মিশতে অনেক লম্বা প্রক্রিয়া। শুধু কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ফ্যাট সহ নানান পুষ্টি রক্তের মাধ্যমে দুধে গিয়ে পৌছায়। সব খাবার কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ফ্যাট হয়ে রক্তে মেশে না কাজেই আমরা যা খাই তার খুব কমই সরাসরি রক্তে মেশে, যেটা যায় সেটা হলো পুষ্টি, কাজেই মায়ের খাবারের সাথে বাচ্চার দুধের সম্পৃক্ততা কম, যা যায় মায়ের শরীর থেকে যায়, বাচ্চার পুষ্টি বাচ্চা ঠিকই নেয়। দরিদ্র অপুষ্টিতে ভোগা মায়েরাও কিন্তু বাচ্চাকে দুধ ঠিকই দিতে পারেন, ক্ষতি হয় মায়ের। তাই পুষ্টিকর খাবার মা খাবে, যাতে মায়ের শরীর ভেঙ্গে না পরে।
খুব রেয়ার কিছু এলার্জেন অনেক সময় মায়ের দুধ থেকে বাচ্চার সমস্যা করতে পারে যদি বাচ্চার এলার্জি বা ইনটলারেন্স থাকে, যেমন যেসব বাচ্চাদের গরুর দুধের মিল্ক প্রোটিনে সমস্যা হয় তাদের মায়েরা গরুর দুধ খেলে অনেক সময় বাচ্চার রিয়াকশন হয়। তবে ব্রেস্টফিডিং মায়েরা বাচ্চার বিশেষ কোন এলার্জি না থাকলে সব খাবারই খেতে পারে।
💜 যে কোন ঔষধ খাবার আগে বা ডাক্তারকে অবশ্যই বলবেন আমি ব্রেস্টফিডিং মা, এটা অনেক সময় মায়েরা ভুলে যায় বা লজ্জায় বলে না। সব ঔষধ ব্রেস্টফিডিং ফ্রেন্ডলি না, অনেক ঔষধ রক্তে মিশে দুধে চলে যায় যাতে বাবুর ক্ষতি হতে পারে। এমন অনেকবার হয়েছে ডাক্তার আমাকে এন্টিবায়োটিক বা অন্য কোন ঔষধ দিয়েছে আমি বলতে ভুলে গেছি পরে লিফলেট পড়ে দেখি ব্রেস্টফিডিং মায়েদের জন্য না। দাঁতের ফিলিং করাবার সময়ও ডাক্তারকে বলবেন আপনি ব্রেস্টফিডিং মা, অনেক সময় অল্প পরিমান মার্কারী ব্লাডে মিশতে পারে ফিলিং থেকে। আপনি না বললে আপনার ডাক্তার জানবে না আপনি ব্রেস্টফিডিং করেন।
💜 গ্যাস হয় এমন খাবার বা ঝাল খাওয়া যাবে না বাচ্চার গ্যাস হবে এটাও ভিত্তিহীন। গ্যাস হবার কারন হলো খাবারে থাকা insoluble fiber যেটা ঠিকমতন হজম হয় না, সেটা কখনোই রক্তের সাথে মেশে না, কাজেই সেটা দুধে মেশার কোন কারন নেই। ঝাল খাবার না খাওয়ারও কোন কারন নেই। কিছু কড়া খাবারের স্বাদ দুধে চলে যায় যেমন রসুন বা মরিচ তাতে বাচ্চার কোন অসুবিধা হয় না বরং এটা দুধের স্বাদে ভিন্নতা আনে, ৬ মাসে যখন বাচ্চা সলিড খাবে তখন সে সহজে খাবারে অভ্যস্ত হবে কারন কিছু স্বাদের সাথে সে আগে থেকেই দুধের মাধ্যমে পরিচিত। সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে শুধু যখন বাচ্চার এলার্জিজনিত সমস্যা থাকে যেমন গরুর দুধ ইত্যাদি সেটা অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শে। এছাড়া মা সবকিছু খাবেন। গ্যাস হয় বা বেশী ঝাল বা যেকোন অসাস্থ্যকর খাবার এড়িয়ে চলা ভাল মায়ের নিজের স্বাস্থ্যের জন্য, বাচ্চার দুধ ঠিকই থাকে। আমি স্বাস্থ্যকর স্বাভাবিক খাবার খেয়েছি, কোন কিছু বাদ দেই নি আবার দুধ বেশী হবার বিশেষ কোন খাবারও তেমন একটা পাই নি, বিদেশে একা ছিলাম। প্রচুর পানি আর স্বাভাবিক পুষ্টিকর খাবারই যথেষ্ট। মনে রাখবেন দুধ তৈরী হয় রক্ত দিয়ে সরাসরি খাবার থেকে নয়।
💜 মায়ের দুধ বাড়ানোর একটাই উপায় সেটা হলো যত বেশী দুধ আপনার শরীর থেকে বের হবে, সেটা বাবু খেয়ে হোক বা পাম্প করে হোক, আপনার শরীর অত দুধ তৈরী করবে, এটা সাপ্লাই এন্ড ডিমান্ডের ভিত্তিতে কাজ করে। কোন টোটকায়, ঔষধে বা বিশেষ খাবারে দুধ বাড়ানোর তেমন ক্ষমতা নেই। তার চেয়ে বাচ্চা খোলা বুকে রেখে স্কিন টু স্কিন অনেক বেশী কাজ করে কারন আমাদের ব্রেইনে দুধ বাড়ানোর হরমোন নিঃসরণ করে॥
💜 বাবু বারবার যদি দুধ চায় একে বলে ক্লাস্টার ফিডিং, তার মানে এই না বাবু দুধ কম পাচ্ছে তার মানে সে বেশী বেশী দুধের অর্ডার দিচ্ছে কারন সে বেশী বেশী বড় হচ্ছে! সাপ্লাই এন্ড ডিমান্ড!
💜 ব্রেস্টমিল্কের প্রথম দিকে পানির পরিমাণ বেশী থাকে যেটাকে বলে Foremilk, পরে ঘন ফ্যাটযু্ক্ত দুধ আসে যেটা Hindmilk. দুটাই বাবুর জন্য দরকারী তাই একবারে একটা স্তন পুরো খালি করে পরের বার অন্যটা দিতে হয়। পাতলা দুধ ঘন দুধ ইমব্যালান্স হয়ে গেলে অনেক সময় বাবুর সবুজ পটি হয়।
💜 মার ঠান্ডা লাগলে দুধ খাওয়ালে বাচ্চারও ঠান্ডা লাগবে, এটাও সত্যি না। ঠান্ডা লাগে ভাইরাসের কারনে সেটা মা কোলে নিলেও বাচ্চার হতে পারে, দুধের মাধ্যমে জীবানু ছড়ায় না বরং বাচ্চার জন্য প্রয়োজনীয় এন্টিবডি থাকে।
💜 বাচ্চা কতটুক দুধ পাচ্ছে সেটা পাম্পিং করে বোঝার কোন উপায় নেই। বাচ্চা যখন দুধ খায় তখন বাচ্চার প্রতি যে ভালোবাসা, বাচ্চার গায়ের গন্ধ, আবেগ সবমিলিয়ে যে হরমোন নিঃসারিত হয় সেটা থেকে অনেক বেশী দুধ বাচ্চার মুখে আসে। পাম্পের প্রতি আমাদের কোন আবেগ নেই কাজেই পাম্প খুব কম দুধ বের করে আনতে পারে। আমার কখনো পাম্পে খুব বেশী আসতো না কিন্তু আসলান সবসময় পেট ভরেই খেত।
💜 রাতে বাচ্চা কম ঘুমালে ফরমুলা দিলে ভাল ঘুমায় এটা কিছুটা সঠিক হলেও এটার কারন হলো ফরমুলা হজম হতে সময় বেশী লাগে তাই অনেকক্ষন বাচ্চার ক্ষুধা লাগে না। মায়ের দুধ সহজপাচ্য তাই বারবার রাতে খেতে চায়। ফরমুলা অবশ্যই পরিস্থিতি অনুযায়ী মায়ের সিদ্ধান্ত, তবে কখনোই মায়ের দুধের কোন বিকল্প নয়। আসলানের যখন ১৩ মাস বয়স তখন ২-৩ রাত ঘুম থেকে উঠে কেঁদেছে, দুধও মুখে নিত না এবং আমাদের চিনতে পারতো না, কিছুতেই থামতো না ৩০ মিনিট চিৎকার করে তারপর থামতো তখন সীমান্ত খালি বলতো রাতে ওর ক্ষুধা লাগে তাই কাঁদে মনে হয় মায়ের দুধে পেট ভরে না। আসলে ঐটা ওর একটা ডেভেলপমেন্টাল ফেইজ ছিল, আমি তাও ওকে কোন ফর্মুলা দেই নি, কারন এই বয়সী বাচ্চার পুরো রাত ঘুমানোর কথা হঠাৎ সে ক্ষুধার জন্য কাঁদবে না। লিপ শেষ হবার পর ঠিক হয়ে গেছে। সব কান্নার অর্থ ক্ষুধা না।
💜 মায়ের দুধের ব্যাথা নিরাময় ক্ষমতা আছে। আমার বাচ্চাদের আমি অনেক ভ্যাকসিন দিয়েছি দুধ খাওয়ার সময়, বাচ্চা টেরও পায় নি। দুই বাচ্চার মোসলমানি সারকুমসাইসেশন করলাম ১৬ দিন এবং ২৮ দিন বয়সে তাও সাথে সাথে দুধ দিয়েছি কান্না থেমে গেছে। মায়ের দুধের ঔষধি গুনের কোন তুলনা নেই, যে কোন স্কিনের সমস্যায় এবং আরো অনেক সমস্যায় আমি ব্রেস্টমিল্ক ব্যাবহার করেছি, সবসময় ব্রেস্টমিল্ক দিয়ে গোসলও দিয়েছি। সত্যিই এটা লিকুইড গোল্ড ।
💜 ফিড অন ডিমান্ড মানে বাবু যতবার যতক্ষন চাইবে সেভাবে খাওয়ানোই বেস্ট স্ট্রাটেজি, ফরমূলার মতন ঘড়ি ধরে খাওয়ানোর দরকার নেই বাবুর বিশেষ প্রয়োজন না থাকলে।
💜 বাবুর অসুখ করলে ব্রেস্টমিল্কের রং এবং কম্পোজিশন বদলায় বাবুর প্রয়োজন অনুযায়ী।
💜 স্তন্যপান কারো কারো জন্য অত্যন্ত সহজ কারো কারো জন্য ভয়ঙ্কর কঠিন, আমার দারুন বিভীষিকাময় সময় গেছে। ঠিকমতন বাচ্চা ল্যাচ না করাতে পারলে অনেক ভয়াবহ সমস্যায় পরতে হয়।
আমার দুই বারই চার দিন পরে দুধ এসেছে, ততদিনে পালোয়ান টেনে নিপল এত বাজেভাবে জখম করেছে তার কাছে সিজারের ব্যাথা কিছুই না। ও যতবার টানতো মনে হতো হাজার ছুড়ি দিয়ে কেউ কোপাচ্ছে আমাকে, সেই যন্ত্রনা ভোলার না। তারপরও যে ব্রেস্টফিডিং করতে পেরেছি সেটাই আমার সবচেয়ে বড় অর্জন। আমি বিশ্বাস করি আমার ছেলের সাথে আমার এই মজবুত বন্ডিংয়ে অনন্য ভুমিকা রেখেছে ব্রেস্টফিডিং। তবে বাচ্চার সুস্বাস্থ্যই অগ্রাধিকার সবার আগে, বোতল নাকি স্তন সেই সিদ্ধান্ত নেবেন শুধুই মা, যেহেতু পুরোটা চাপ মায়ের শরীরের উপরে যায় এই সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করার অধিকার আর কারো নেই।
💜💜💜 তাই তো প্রকৃতির কোলে কীর্তনখোলা নদীর ধারে বসে পালোয়ান মায়ের দুধ খাচ্ছে, মায়ের বুকের দুধও নদীর মতই বহমান, নদীর মতই শিশুকে পুষ্টি, আরাম এবং আশ্রয় দেয়। হয়তো এই জন্যই নদীকে মায়ের মতন বলা হয়!
আশা চৌধুরী
#পালোয়ানের_বাংলাদেশ_ভ্রমন