17/03/2026
এমন দৃশ্য আমি কখনো দেখিনি। অনেক শাইখ-শাইখাকে শুনিয়েছি, তারাও জীবনে এমন অলৌকিক কিছু দেখেননি।
দিনটি ছিল আর পাঁচটা দিনের মতোই। কর্মস্থল থেকে ফোন এলো, ‘উম্মু ফিরাস! একটি লাশ এসেছে...একজন বয়স্ক মহিলার, আপনি কি এখন আসতে পারবেন?’
আমি মৃত-নারীদের গোসল করাই। আমাদের সৌদি আরবে সরকারিভাবে লাশ গোসল করানোর জায়গা আছে। ফ্রিতেই গোসল করানো, কাফন-দাফন করানো যায়। আবার কেউ চাইলে ফোন করে কোনো কর্মীকে বাসায় ডাকতে পারেন লাশ গোসল করানোর জন্য।
তো, গোসলখানায় গিয়ে দেখলাম বেশ কয়েকজন নারী কান্নাকাটি করছেন। কাঁদতে কাঁদতে যেন জীবনই ছেড়ে দিবেন। দেখে খারাপ লাগল, আবার ভালোও লাগল। ভালো লাগার কারণ, আমাদের এখানে যে লাশগুলো আনা হয়, সেগুলোর সাথে সচারচর এত মানুষ থাকে না। অনেক সময় দরকারেও লাশের আত্মীয়স্বজনকে কাছে পাওয়া যায় না। বেশিভাগ সময় লাশ রেখে চলে যায়, গোসল করানোর পর এসে নিয়ে যায়। থাকলে থাকে এক-দুজন। গোসল করানো, কাফন পরানো—সব আমরাই, গোসলখানার কর্মীরাই করি। কখনো কখনো তো দাফনের দায়িত্বও গোসলখানার লোকদের ঘাড়ে দিয়ে দেয় আত্মীয়রা।
কিন্তু এই লাশের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। দেখলাম কয়েকজন বয়স্ক মহিলা ‘মা, মা’ বলে কাঁদছেন। মানে যিনি মারা গেছেন, তিনি উনাদের 'মা' হন। ভাবছি, এই মহিলাদের বয়সই তো ষাট-সত্তরের কম হবে না, তাহলে মৃতার বয়স কত!
আমি উনাদেরকে সান্ত্বনা দিলাম। ‘আল্লাহ আপনাদের মায়ের ওপর রহম করুন। তাকে জান্নাতবাসী করুন। একটু শান্ত হোন। কারোরই মা-বাবা চিরদিন বাঁচে না। আমাদের সবাইকেই এক দিন না এক দিন মরতে হবে।’
কিন্তু উনারা এমন ব্যাকুলভাবে কাঁদছিলেন, কখন যে আমার নিজের চোখে পানি চলে এসেছে, বুঝতেও পারিনি।
কিন্তু এঁদের সাথে বসে কান্নাকাটি করলে চলবে না। লাশ গোসল করাতে হবে। আমি যখন গোসলখানার দিকে যাচ্ছি, তখন মহিলাদের আরেক আহাজারি। ‘আমাকে সাথে নিবেন, আপা?’ ‘আমিও গোসল করানোর সময় থাকতে চাই!’ ‘আমি কি আপনার কোনো হেল্প করতে পারি?’ ‘আমাকেও সাথে নিন, প্লিজ!’ ‘শেষবারের মতো মায়ের খেদমত করতে চাই, আমাকে নিন না!’
গোসল করানোর সময় সবাই সাথে থাকতে চাচ্ছেন!
সাধারণত আমি এক-দুজনকে সাথে নিই। কিন্তু উনাদের সবার আবেদনই এত আকুল, কাউকে ফেলতে পারলাম না। এরপর একেকজনকে একেক দায়িত্ব দিলাম। ‘আপনি পানি এগিয়ে দিবেন’, ‘আপনি আতর’, ‘আপনি গোলাপজল’...এভাবে সবাইকে একটা করে কাজ দিতে হলো।
গোসল করাতে গিয়ে দেখি মৃতা প্রায় শতবর্ষী এক বৃদ্ধা। ঠিক কাঠের পুতুলের মতো, গায়ে গোশতের বালাই নেই! কুঁচকানো চামড়ায় জড়ানো হাড় জিরেজিরে এক শরীর। গায়ের রং পাণ্ডুর। চুলগুলো সব পেকে সাদা হয়ে গেছে। বয়সের ভারে পা দুটোও শীর্ণ, কুঁকড়ে এসেছে। নিজে নিজে চলতে পারত নাকি কে জানে! হাতেও হাড় আর চামড়া ছাড়া কিছু নেই। পুরো শরীরটাই ভীষণ নাজুক। ওজনই নেই বলতে গেলে।
যাহোক, গোসল করাতে করাতে টের পেলাম ক্ষীণ কায়ার এই নারী দুনিয়ার জীবনে নিশ্চয় নেককার ছিলেন। কীভাবে বুঝলাম? লাশ গোসল করানোর অভিজ্ঞতা থেকে আমরা বুঝি এসব। কারণ নেককার বান্দাদের গোসলটা সহজ হয়, আর যারা ভালো আমল করেনি তাদেরটা হয় কঠিন। ভালো ব্যক্তিদের গোসল করানোর সময় মনে হয়, লাশটাও যেন গোসলে সাহায্য করছে। সবকিছু ইজিলি হয়ে যায়। বিরাট শরীরের লাশকে গোসল করাতেও হ্যাসেল পোহাতে হয় না।
কিন্তু অনেক সময় দেখা যায়, হালকা-পাতলা শরীরের লাশও গোসল করানোর সময় অনেক ভারি লাগে। দু-তিনজন মিলে তার হাত-পা উঠানো যায় না! মনে হয়, সে হয়তো চাচ্ছে না তাকে গোসল করানো হোক, কবরে নিয়ে যাওয়া হোক।
সহিহ বুখারিতে এসেছে—
“যখন জানাযা (লাশ) বহন করে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন যদি মৃত ব্যক্তি নেককার হয়, সে বলে: ‘আমাকে তাড়াতাড়ি নিয়ে চলো, আমাকে তাড়াতাড়ি নিয়ে চলো।’
আর যদি সে নেককার না হয়, তখন সে বলে: ‘হায় আফসোস! তোমরা তাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছ?’
এই মহিলাও যেন তাড়াতাড়ি কবরে যেতে চাচ্ছেন। শান্তি লাগছিল আমারও। উনার মেয়েরা তখনো কেঁদে আকুল। কেউ উনার জন্য দুয়া করছেন। কেউ গায়ে আতর ছুঁয়ে দিতে দিতে চোখের পানি ফেলছেন। উনাদেরকে রেখে আমি পাশের রুমে গেলাম।
কাফনসহ কিছু জিনিস আনতে পাশের ঘরে গিয়েছি। প্রায় এক মিনিটের মাথায় গোসলঘরের ভেতর থেকে চিল্লাচিল্লি কানে এলো।
‘ও অমুক! দেখে যা!’ ‘এই মেয়েরা, আসো, দেখে যাও কী হয়েছে!’ সেই সাথে কান্না আর আহাজারি।
ভয়ে আমার কলিজা শুকিয়ে গেল। হাতের জিনিসপত্র ফেলে দিয়েই গোসল ঘরে ছুটে এলাম। এরপর যা দেখলাম...সুবহানআল্লাহ! এরকম অলৌকিক দৃশ্য আমার জীবনে কখনো দেখিনি।
গিয়ে দেখি—যেই লাশের সবগুলো চুল পেকে পাটের আঁশের মতো হয়ে গিয়েছিল, তার সবগুলো চুল কালো হয়ে গিয়েছে। শুধু তা-ই নয়, তার মুখের কুঁচকানো চামড়া আর নেই। সব টানটান হয়ে গিয়েছে। কাফন সরিয়ে তার হাত-পাগুলোও দেখলাম আমি। আগের মতো শীর্ণকায় নেই, টান-টান শক্তিসমর্থ দেখাচ্ছে। তার বয়স যেন একশ বছর নয়, তার বয়স ত্রিশ বছর!
এই দৃশ্য দেখেই সবাই উত্তেজিত হয়ে পড়ে। বৃদ্ধার মেয়েরা বলতে শুরু করে, ‘ও আমার মা রে! আমার মা জান্নাতবাসী হয়ে গেছে রে!’ ‘আল্লাহু আকবার!’
আমার তো হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে গেছে, ভয়ে, আতঙ্কে আবার আনন্দেও। অনবরত বলছি ‘সুবহানআল্লাহ!’ ‘মাশাআল্লাহ!’ ‘আল্লাহু আকবার!’
একটু পর সংবিৎ ফিরে পেয়ে বললাম, ‘আল্লাহর দোহায় লাগে, আপনারা একটু শান্ত হোন। আল্লাহ উনাকে উত্তম প্রতিদান দিবেন ইনশাআল্লাহ, কিন্তু আমাদের কাজ তো আমাদেরকে করতে হবে। কাফন পরানো শেষ করতে দিন।’
মৃতার কন্যাদেরকে সরিয়ে রেখে কাফন পরানো শেষ করলাম। যখন চেহারা ঢাকতে যাব, তখন আরেকটি ব্যাপার ঘটল। লাশের চেহারায় এত নুর...সুবহানআল্লাহ...আমি তাকাতে পর্যন্ত পারছিলাম না। নুরে চোখ ঝলসে যাওয়ার অবস্থা। তাও সাদা কাপড়ে চেহারা ঢেকে গিঁট দিয়ে কাফন সম্পন্ন করতে হলো।
কাজ শেষ হওয়ার পর, উনার মেয়েরা যখন একটু শান্ত হয়ে এসেছে, উনাদেরকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আল্লাহর দোহায়, আমাকে একটু বলুন আপনাদের মা কোন কোন নেক আমল করতেন?’
আমাকে বলা হলো, ‘কোন নেক আমল করতেন না, তাই বলুন! আমরা উনাকে সব রকমের নেক আমল করতে দেখেছি, কিন্তু তারচেয়েও বেশি আমল উনি করতেন গোপনে। ইয়াতিমদের দায়িত্ব নেওয়া, বিধবাদের খরচ দেয়া, বিভিন্ন মানুষকে-বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সাদাকা করা—কিছুই বাদ দিতেন না। আর এগুলোর কোনোটাই উনি আমাদেরকে জানাতেন না যে—‘অমুক ব্যক্তিকে আমি টাকা দিই, অমুক জায়গায় সাদাকা করি’। কোনোভাবে সামনে আসলে তখন আমরা জানতে পারতাম। উনার গোপন আমলের পরিমাণই বেশি। সেগুলোর কথা কেবল মা আর আল্লাহ জানেন।’
তাদের উত্তর শুনে আমি বুঝতে পারলাম, কেন শেষ বিদায়ের সময় আল্লাহ এই নারীকে সম্মানিত করলেন। দুনিয়ার জীবনে তিনি কাজ করেছেন আল্লাহর জন্য, তাই আল্লাহ তাঁর মেহমানকে গ্রহণ করেছেন উত্তম মেহমানদারিতার সাথে।
[সৌদি আরবের একটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে]
( সংগৃহীত )