05/06/2026
এক বদমায়েশ বুড়ো ৩৮ বছর পর নিজ বাড়িতে ফিরেছে। স্ত্রী তাকে ঘরে জায়গা দেয়নি।
এই নিউজের শিরোনাম হওয়া উচিত ছিলো -
''দয়ামায়াহীন পাষণ্ড বুড়োর ৩৮ বছর পর ঘরে ফেরা, মিলেনি ঠাই।'
''অথৈ সাগরে হাবুডুবু খাওয়া এক নারীর/ মায়ের ৩৮ বছরের সংগ্রাম!'
কিন্তু সংবাদমাধ্যম শিরোনাম করেছে -
১) স্ত্রীর উপর রাগ করে ৩৮ বছর নিরুদ্দেশ, বাড়ি ফিরলেও মিলেনি শান্তি।
২) দাম্পত্য কলহে ৩৮ বছর ধরে রাগ করে বাড়ি ছাড়লেও , ভাঙ্গেনি স্ত্রীর রাগ।'
এই লোক যে পাষণ্ড/দয়ামায়াহীন। এটা শিরোনামেই উল্লেখ খুব প্রয়োজন ছিলো। অনেকেই নিউজ পড়ে না। না পড়েই গালি দেয়।
তো এই নিউজের কমেন্ট সেকশনে অনুভূতিহীন কিছু মানুষের মন্তব্য - বুড়ির ত্যাজ এখনও কমে নাই। বুড়ির জন্যই বুড়ো এই সংসার ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিলো। বুড়িই খারাপ।
তবে বেশীরভাগ মানুষেরই বুড়ির কষ্ট অনুভব করে সাপোর্ট করেছে। এটা দেখে খুব ভালো লাগলো।
সম্পর্কের ক্ষেত্রে পুরুষের চেয়ে নারীর মধ্যে ঘিনপিত খুব কম থাকে। এই ঘিনপিত বলতে আত্মসম্মানবোধের কথা বুঝাচ্ছি। সম্পর্কের মায়াজালে হোক সেটা ভালোবাসা কিংবা পায়ের নিচে শক্ত মাটির অভাব, নারীকে ঘিনপিত বা আত্মসম্মানহীন বানিয়ে তুলে।
শত কষ্ট, অপমান দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করে। শুধুমাত্র সংসার টিকিয়ে রাখার জন্য। সংসার হয়তো টিকে যায়। কিন্তু সে একজন অসুখী মানুষ আমৃত্যু সুখী হওয়ার অভিনয় করে যায়।
৩৮ বছর। ১৩৮৭৯ দিন। ১.১৯৯ বিলিয়ন সেকেন্ড!
স্বামীহীন যুবতী নারী থেকে বৃদ্ধায় রূপান্তরিত মহিলা একাকী কীভাবে কাটালো?
চোখ বন্ধ করতেই ভেসে উঠে, স্বামীহীন সন্তানকে নিয়ে বাপের বাড়িতে ভাবী-ননদ কিংবা পাড়া প্রতিবেশীদের খোঁটা, বাঁকা চাহনী।
সেখানেও শান্তি না মিলায় তিনবেলা ছেলের মুখে এক মুঠো ভাত জুটানোর জন্য নিজের সংগ্রাম। কখনও আধবেলা খেয়ে, কখনও লতাপাতা খেয়ে বেঁচে থাকা। মানুষের বাসায় ঝি চাকরানীর কাজ করা।
ভাত কাপড়ের জোগানের পেছনে ছুটতে গিয়ে ছেলেকে শিক্ষিত করতে না পারার ব্যর্থতা।
সংসার জীবনে সবচেয়ে বড় যেই সুখ, যাকে ভালোবাসা বলি আমরা।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে একটু সুন্দর করে সাজিয়ে, স্বামীর সামনে আসা, স্বামীর সাথে আদর সোহাগে মেতে উঠা।
সবকিছু থেকে একজন যুবতী নারীকে বঞ্চিত করে, সন্তান ধরিয়ে দিয়ে অথৈ সাগরে ভাসিয়ে চলে গেলো। এই দুটো প্রাণী কী খাচ্ছে, কীভাবে চলছে একটিবারও মনে পড়েনি। যত বড় অভিমান হোক। দোষ স্ত্রীর হলেও তুই ডিভোর্স দিয়ে চলে যেতি। সন্তানটাকে নিজের কাছে নিয়ে নিতি।
কিন্তু একটা নারীর জীবনকে ধ্বংস করে, একটা শিশুর ভবিষ্যৎ নষ্ট করে দিয়ে ঐ মুখ নিয়ে কীভাবে হাজির হয়?
শুনলাম বুড়ো অন্য জায়গায় বিয়ে করেছিলো। দারুণ মজা মাস্তিতে কাটিয়েছেন ৩৮ বছর। দ্বিতীয় স্ত্রী মরে যাওয়ার পর তার সেবাযত্ন করার কেউ নেই। তাই এখন মনে পড়েছে প্রথম স্ত্রী ও সন্তানের কথা।
আর সংবাদ মাধ্যম কীনা শিরোনাম করেছে - 'স্ত্রীর উপর রাগ করে ৩৮ বছর নিরুদ্দেশ, বাড়ি ফিরলেও মিলেনি শান্তি। ছ্যাঃ!
তাই বৃদ্ধাকে দোষী বলার আগে, নিজেকে কিংবা নিজের মাকে বৃদ্ধার জায়গায় কল্পনা করার চেষ্টা করবেন। দেখবেন ব্যথায় বুকটা নীল হয়ে আসবে। সহ্য করতে পারবেন না।
মহিলা মানুষের ঘিন নিয়ে একটা গল্প বলি -
এক মামীকে চিনতাম। আমাদের টিভি থাকা সত্ত্বেও উনাদের বাসায় সবাই আড্ডা দিয়ে টিভি দেখতাম। আমরা আলিফ লায়লা, সিনবাদ দেখতাম। অথচ মামী উঠোনে বসে থাকতো। উনি টিভি দেখতেন না। পরে শুনেছিলাম, উনাকে মামা একদিন কোন টিভি দেখা নিয়ে রাগ করে বলেছিলো- তোর বাপের টিভি? সারাদিন দেখিস? ব্যাস। ঐ কথাটা উনার মনের ভেতরে এমন ঘিন জন্ম দিয়েছিলো। উনাকে ২০ বছর আমরা কেউ টিভি দেখতে দেখিনি। মামা হাত পা ধরে মাফ চেয়েও দেখাতে পারেনি।
যা বলছিলাম। মহিলা মানুষ সম্পর্কের ক্ষেত্রে খুব বেহায়া, ঘিনপিতহীন হয়। কিন্তু একবার যদি মহিলা মানুষের মন থেকে কেউ উঠে যায়। তাহলে ঐ মনে ঠাই পাওয়া খুব কঠিন জিনিস।
আর এই ঘিনপিত শুধু মহিলা নয়। প্রতিটি মানুষের মধ্যে থাকা উচিত। এই আত্মসম্মানবোধ আমাদেরকে ডোমিনেট করা মানুষগুলোর কাছ থেকে বাঁচাবে।
আমি প্রায়ই বলি - মানুষের জীবন কোন ভিডিও গেমস নয় যে, যখন তখন রিস্টার্ট বাটনে চাপ দিয়ে, নতুন শুরু করবো! গেমওভার করতে পারবো!
ছোট্ট একটা জীবন। একটাই লাইফলাইন।
বুক ভরা অতৃপ্ততা, অনাদর, অত্যাচার সহ্য করার জন্য কারোই জন্ম হয়নি। প্রতিটি মানুষের অধিকার ভালো থাকা, ভালোবাসা পাওয়ার, সম্মানের সাথে বাঁচার।
এই লাইফে প্রবেশ করে, ধ্বংস করার চাবি কাউকেই দেওয়া হয়নি। যে ধ্বংস করেছে বা করার চেষ্টা করেছে। তাদের কাউকেই দ্বিতীয়বার সুযোগ দেওয়া আর আত্মহনন করা একই কথা।
সব ভুল ক্ষমাযোগ্য নয়। সব সম্পর্ক পুনরুদ্ধারযোগ্য নয়। অন্ধকারে ফেলে যাওয়া মানুষ ফিরে এলে, সে হাত ধরতে হয় না। সব ভুলে ঘরে তুলতে হয় না।
বন্ধ দরজার এপারে চাবি হাতে নিয়ে থাকা মানুষটির অবশিষ্ট আত্মসম্মান বোধটুকুই বেঁচে থাকার শেষ সম্বল। এই আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করার জন্য পুনঃপ্রবেশের আর সুযোগ নেই। আর কাউকে সুযোগ দেওয়া উচিত না।
- অন্তর মাশঊদ