04/08/2024
যে-তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে ছিয়ানব্বইয়ে লাগাতার হরতাল দিয়ে সহিংসতা চালিয়ে দেশটাকে নরককুণ্ড বানিয়েছিলেন, ক্ষমতায় এসেই সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার একরাতে বিলুপ্ত করে দিলেন। লোকজন কিছু বলল না, রাজা-বাদশাদের ব্যাপার ভেবে চুপ থাকল। যুদ্ধাপরাধীরা ফাঁসিতে ঝুলতে লাগল। জামায়াত কিছুটা সহিংসতা চালালেও তা ছিল বিচ্ছিন্ন, সাধারণ মানুষ তাতে অংশ নেয়নি। দেশের সবগুলো সেক্টরকে ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে পঙ্গু করে দিলেন; সবচেয়ে ছোট যে-দুর্নীতিবাজটা ধরা পড়ে, সেও একশো কোটি টাকার মালিক; আপনার চারশো কোটি টাকার পিয়নকে নিরাপদে দেশ ছেড়ে যাওয়ার রাস্তা আপনিই করে দিলেন; আপনার আইজি, আপনার সেনাপ্রধান দুর্নীতির পাহাড় গড়ল; লোকজন কিছু বলল না, ভাবল আপনার আশেপাশের সবাই বদ হলেও অন্তত আপনি সৎ। জিনিশপত্রের দাম নজিরবিহীন রকমের বাড়তে লাগল, কথায়-কথায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা দিয়ে একে-ওকে জেলে পুরলেন, দেশে বিরোধীদল বলে কোনোকিছুর অস্তিত্বই রাখলেন না; লোকজন কিছু বলল না। আপনার দলের ও সরকারের অনিয়ম নিয়ে যখনই কেউ প্রশ্ন করে; আপনি তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে কথা বলেন, সবার সাথে বেআদবি করেন; এটা বন্ধ করে দেব, ওটা বন্ধ করে দেব, সেটা কেটে দেব বলে হুমকিধামকি দেন; আন্দোলন করতে-করতে টায়ার্ড হয়ে গেলে আলোচনায় বসব বলে বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষকদেরকে টিটকারি মারেন, আপনি কাউকেই ন্যূনতম সম্মান দিয়ে কথা বলেন না; দ্রব্যমূল্য নিয়ে প্রশ্ন করলে যথাযথ পদক্ষেপ না-নিয়ে কাঁঠাল দিয়ে বার্গার বানানোর রেসিপি ধরিয়ে দেন; লোকজন কিছু বলল না। নিজের দলেও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন কাউকে পাশে রাখলেন না, সৈয়দ আশরাফকে বিদায় দিয়ে কাদেরের মতো নিকৃষ্ট নরাধমকে টানা তিনবার দলের সেক্রেটারি বানালেন; সবাই আপনার পদলেহন করুক, আপনি সেটাই চাইলেন। সেটাকে আপনার অভ্যন্তরীণ ব্যাপার ভেবে লোকজন চুপ থাকল। জোড়া সাংবাদিকহত্যার (সাগর-রুনি) বিচার ঝুলিয়ে রেখেছেন এক যুগ ধরে, চার্জশিটের তারিখ পেছাল শতাধিকবার; আপনি যখন বলে দিয়েছিলেন সরকার বেডরুমের নিরাপত্তা দেবে না, বিচার সেদিনই শেষ; ক্রসফায়ারের জন্য আপনার র্যাবপ্রধান আমেরিকার স্যাংশন খায়, লোকজন কিছু বলল না। নিজের সন্তানদেরকে বিদেশে নিরাপদে রেখে অন্য মায়েদের ছেলেমেয়েদেরকে ছাত্রলিগ সাজিয়ে শিক্ষাঙ্গণগুলো আপনি কবজায় রাখতে চাইলেন, ছাত্রলিগের ঐ ছেলেমেয়েরা আহত-নিহত হলে আপনার দল খবরও রাখে না, ধুঁকে মরে; আপনি ত্যাগীদেরকে মূল্যায়ন করেন না, প্রবীণ নেতাদেরকে বসিয়ে রেখে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাশূন্য নর্তকী-জুয়াড়িদেরকে ধরে-ধরে এমপি বানিয়েছেন। আপনি নিজেই যাকে প্রধান বিচারপতি বানালেন, তাকেই দেশছাড়া করলেন। আপনি বিচার বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ, পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিডিআর— নিজ স্বার্থে ব্যবহার করে সব খতম করে দিলেন। একেক বছর একেক রকম প্রশ্নপদ্ধতি, উদ্ভট পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন, সমস্ত পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস— সব মিলিয়ে আপনার আমলে লেখাপড়ার বারোটা বাজল; যে-অভিভাবকরা এর প্রতিবাদ করেছে, আপনি তাদেরকেও গ্রেপ্তার করতে ছাড়লেন না। লোকজন কিছুই বলল না। আপনি টানা তিনটা ভুয়া নির্বাচন করলেন, নির্বাচনব্যবস্থা নির্বাসনে পাঠালেন, জেনারেশন জেড জানেই না ভোট দেওয়ার অভিজ্ঞতা কেমন। লোকজন তাও কিছু বলল না। আপনার মন্ত্রীরা, আপনার নিযুক্ত উন্মাদ বিচারপতি, আপনি নিজে যাকে-তাকে যখন-তখন রাজাকারের বাচ্চা, পাকিস্তানের প্রেতাত্মা, জামায়াত-শিবির বলে গালাগাল করলেন; অথচ আপনি প্রেসসচিব বানিয়েছেন একজন রাজাকারের বাচ্চাকে, নিজের মেয়ে বিয়ে দিয়েছেন রাজাকারপরিবারে। লোকজন কিছু বলল না।
আপনার পুলিশ একদিনে ছয়টা ছাত্র মেরে ফেলল। একদিন বিরতি নিয়ে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে গণহত্যা চালাল। আপনি ভাবলেন দুই-চারশো মেরে ফেললেও লোকজন কিছু বলবে না। এত সহজ ভাবলেন কেন সবকিছু? স্বজন হারানোর বেদনা আপনি একাই বোঝেন? অন্যদের স্বজনরা স্বজন না? প্লাস্টিক? স্বজন হারানোর বেদনাকে পুঁজি করে কয় শতাব্দী চলা যায়? গণহত্যা অব্যাহত রেখে আপনি আলোচনায় ডাকলেই শতসহস্র লাশ মাড়িয়ে লোকজন আপনার কাছে দৌড়ে গিয়ে স্যান্ডউইচ খেয়ে আপনার সাথে ছবি তুলে ফেসবুকে কাভার ফটো দেবে— আপনি এমনটা ভাবেন কেন? আপনার এত অতি-আত্মবিশ্বাসের উৎস কোথায়? কেন ভাবলেন 'স্বজন হারানোর বেদনা আমি বুঝি বলে' কেঁদে দিয়ে আপনি টিশু দিয়ে নাক মুছলেই এতগুলো মানুষের রক্তের দাগ মুছে যাবে? এত সোজা?
Copyright :আখতারুজ্জামান আজাদ