19/11/2025
🩸 “আমি আজও সেই ঘরের সামনে দাঁড়াতে পারি না…”
(আমার বন্ধুর নিজস্ব অভিজ্ঞতা - ওর ই মুখ থেকে যেমন শুনেছি তেমন ভাবেই তুলে ধরলাম)
@কলমে প্রিয়াঙ্কা
আমার শৈশবটা কেটেছিল মামার গ্রামের বাড়িতে—
পুকুর, খেজুরগাছ, আর সন্ধ্যা হলেই কারেন্ট চলে যাওয়া এই সব কিছু নিয়ে ই আমার শৈশব। আমার যখন ৬ বছর তখন এলো আমার ভাই, আমার মামার ছেলে কিট্টু।
কিট্টু বড় হতে লাগল আর আমাদের দিদি ভাই এর সম্পর্ক টা ততই গভীর হতে লাগলো, কখনও ভাবিনি একদিন ওকে ছেড়ে আমি কলকাতা শহরে চলে আসবো। ছোট বেলা টা খুব সুন্দর ছিল, আমি আর ভাই আমাদের একসাথে দুষ্টুমি, বকা খাওয়া, রাতে আমি ভাই কে নিজের হাতে খাইয়ে দিতাম, তারপর রাতে ২জনে দিদা র কাছে ভূতের গল্প শুনে ঘুমোতে যেতাম। রাতে গল্প শুনে ভাই আমার কাছে লেপ্টে গিয়ে ঘুমাতো। ৬ বছরের ছোট ভাই আমার কাছে খুব আদরের ছিল।
@কলমে প্রিয়াঙ্কা
কিন্তু জীবন পাল্টে গেল।
আমার যখন ১৬ বছর আমরা তখন কলকাতা শহরে চলে এলাম, মা-বাবার সঙ্গে থাকতে থাকতে গ্রামের সাথে যোগাযোগ প্রায় কমেই গেল। কলকাতা অনেক বড় শহর, চোখে কত স্বপ্ন , নতুন স্কুল , নতুন বন্ধু পেয়ে গ্রামের কথা প্রায় ভুলে ই গেলাম। তখন কার দিনে হাতে হাতে মোবাইল ফোন ছিল না, মামার বাড়িতে ল্যান্ড ফোন ও ছিল না। শহরে আমাদের বাড়িতে এলো ল্যান্ডফোন। সেই ফোন থেকে গ্রামের প্রধান এর বাড়িতে ফোন করে বাবা মাঝে মাঝে মামা আর দিদার খোজ করত। ভাই তখন সবে ১১ বছর। ওর সাথে প্রায় কথা হতো ই না।
লাস্ট যে বছর পুজোতে গ্রামের বাড়ি গেলাম সে বছর আমি ২০ তে পা দিয়েছি, কিট্টু তখন ক্লাস নাইন। খুব গল্প হলো , রাত রাত জেগে আমি আর ভাই গল্প করলাম কত। ওর বন্ধু বান্ধব, ভালো লাগা, প্রেম সব শুনলাম। কত হাসলাম দুজনে।
কিট্টুর সঙ্গে আমার সেই শেষ দেখা। মাঝে কেটে গেছে আর ৪ টে বছর। না দেখা , না কথা কোনোটাই আর হয়ে ওঠেনি।
তারপর একদিন—
হুট করে রাত এগারোটার দিকে ফোন এল। মামার কাঁপা গলা, মামা কাদঁছে -
“ কিট্টু আর নেই… লেকের ধারে ওকে মৃত দেহ পাওয়া গেছে।”
@কলমে প্রিয়াঙ্কা
আমরা স্তব্ধ। শব্দ বেরোলো না। মাত্র ২০ বছর বয়স…
এত কম বয়সে কেউ কিভাবে চলে যেতে পারে?
পরদিন ভোরেই রওনা হলাম গ্রামের বাড়ির দিকে।
ট্রেনের জানলার বাইরে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল আমি যেন দাঁড়িয়ে আছি দুই সময়ের মাঝখানে—
একদিকে শৈশবের উজ্জ্বল স্মৃতি, আরেকদিকে এক অচেনা অন্ধকার।
গ্রামের বাড়ি পৌঁছে দেখলাম মামা মামী শোকে পাথর হয়ে গেছে। বাড়ি ভর্তি গ্রামের লোকজন, আরও আত্মীয় রাও এসেছে। দিদা বেঁচে আছে, কিন্তু কিছু বোঝার বোধ শক্তি দিদা অনেক আগেই হারিয়ে ফেলেছে, তাই এত বড় আঘাত দিদা অনুভব করতে পারেনি।
দুপুর বেলা একটু ফাঁকা হতে আমি মামী কে জানতে চাইলাম কিট্টুর মৃত্যু কীভাবে হলো—কিন্তু মুশকিল হলো কেউই পরিষ্কার কিছু বলতে পারছে না। লেকের ধারে রাত ৮টার সময় কারা যেন দেখতে পেয়ে মামা কে বাড়ি এসে জানায় , মামা সাথে সাথে ই যায় , গিয়ে দেখে পুলিশ আগে ই চলে গেছে, এবং কিট্টু কে হাসপাতাল নিয়ে গেছে, মামা হাসপাতাল পৌঁছে জানতে পারে কিট্টু কে যখন নিয়ে আসা হয়েছিল তখন ও ওর শ্বাস চলছিল। কিন্তু ডাক্তার রা কিছু করে ওঠার আগে ই সব শেষ হয়ে যায়।
@কলমে প্রিয়াঙ্কা
সেদিন রাতে আমাকে কিট্টুর ঘরেই থাকতে দিল।
ঘরটা যেমন ছিল তেমনই আছে , শুধু আমার ভাই টা আর কোথাও নাই, আমার চোখ ঠিকরে জল আসছিল —
দেওয়ালে তার ক্রিকেটারদের পোস্টার, টেবিলে অর্ধেক লেখা একটা ডায়েরি, আর জানলাটা খোলা।
ভেতরে ঢুকতেই মনে হলো ঘরের তাপমাত্রা বাইরের থেকে কিছুটা যেন কম। ভাবলাম হয়তো ঘরটা বন্ধ রাখা ছিল বলে এরম মনে হচ্ছে।
আমি শুয়ে পড়লাম। রাত তখন কটা ঠিক বলতে পারব না হঠাৎ ঘুমটা ভেঙে গেল।
হঠাৎ মনে হল ঘরের কোনাতে অন্ধকারের একটা অংশ যেন নড়ছে। টেবিল ল্যাম্প টা জ্বালানোর চেষ্টা করলাম জ্বললো না। চোখ টা ভালো করে কচলে চাঁদের আলোতে দেখলাম—
ঘরের এক কোণে, জানলার নিচে কিট্টু বসে আছে।
আমি তাড়াতাড়ি করে উঠে বসে ওকে বললাম কিরে ভাই তুই কোথায় চিলিস এতক্ষণ, আমি কোন সকালে এসেছি জানিস, তোর এতক্ষণে আসার সময় হলো? পরক্ষণে ই আমার মনে হলো এ আমি কি দেখছি, আর কার সাথেই বা কথা বলছি
আমি কি স্বপ্ন দেখছি? আমার ভাই আমার কিট্টু তো আর নাই, আজ দুপুরে ই ওর দাহকার্য করে ফিরলাম যে।
@কলমে প্রিয়াঙ্কা
আমি ভয়ে জমে গেছিলাম। তখনও কিট্টু ঐখানটা তেই বসে আছে, মনে হলো যেন কিছু বলতে চাইছে
ও ধীরে ধীরে মুখ খুলল,
কিন্তু কিছু শব্দ বেরোল না।
আমি হকচকিয়ে উঠে ভাই বলে ডেকে উঠতেই
হঠাৎ পুরো দৃশ্যটা মিলিয়ে গেল চোখের সামনে থেকে।
পরের দিন সকালে কাউকে কিছু বললাম না। মা বাবা কেও না, ভাবলাম—শক গেছে, হয়তো হ্যালুসিনেশন হয়েছে আমার। একে এ সবাই এত কষ্টে আছে তার ওপর কি বলব এসব।
কিন্তু দ্বিতীয় রাত…ঘটনাটা আবার হল।একই সময়, একেবারে একই জায়গায় , কিট্টু বসে আছে। ঘরটা চাঁদের আলোয় ভরে আছে , পরিষ্কার দেখলাম ওর মুখ নড়ছে, কিন্তু শব্দ নেই।
@কলমে প্রিয়াঙ্কা
আমি কাঁপতে কাঁপতে বললাম,
“কিট্টু? তুই কি…আমাকে কিছু বলতে চাইছিস?”
ও মাথা নাড়ল—হ্যাঁ।
আমি এবার সাহস করে ওঠার চেষ্টা করলাম। কিন্তু ঠিক তখনই— ওর দৃষ্টি হঠাৎ বদলে গেল।কালো, গভীর…
আমার দিকেই তাকানো।
একটা ঠান্ডা ঝটকা যেন বুকের মধ্যে ঢুকে গেল। আমি নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললাম। মনে হচ্ছিল আমার শরীরটা আর আমার নেই।
পরের ঘটনাগুলো আমাকে আজও কাঁপিয়ে দেয় আমার নিজের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ ই ছিল না এই ঘটনা গুলো যখন ঘটিয়েছি আমি।
আমি হঠাৎ উঠে দাঁড়ালাম। আমার শরীর নিজের মতো চলছিল—আমি চাইছি না তবু এগিয়ে যাচ্ছি।
সোজা গিয়ে দাঁড়ালাম আমার মামার ঘরের সামনে।
@কলমে প্রিয়াঙ্কা
তারপর দরজা খুলে এমন গলায় কথা বললাম—যে গলা আমার ছিল না।
“বাবা… আমাকে ওরা মেরে ফেলেছে… লেকের ধারে ডেকে নিয়ে গেছিল। ঝিমলি কে আমি ভালবাসতাম, ওর দাদা আর কাকা ওরা রাগে আমার মাথায় লাঠি মারে… যতক্ষণ না আমি মরে যাচ্ছি লাঠির বাড়ি দিতে থাকে, আমি অজ্ঞান হয়ে গেলে
আমাকে ঠেলে দেয় জলের মধ্যে। ভেবেছিল আমি মরে গেছি। আমি জল থেকে উঠে তোমার কাছে আসার চেষ্টা করি কিন্তু আর পারিনি বাবা। আমার কোনো দোষ ছিল না বাবা।"
আমি নিজের মুখ থেকে এসব কথা বেরোতে শুনছিলাম,
কিন্তু আমি ছিলাম না- কিট্টু কথা বলছিল আমার শরীর দিয়ে।
@কলমে প্রিয়াঙ্কা
মামা কেঁপে উঠলেন, “কারা? কারা করল রে এতবড় সর্বনাশ?”
আমার ঠোঁট নড়ল— “ওরা লাঠিটা ফেলে দিয়েছে পাশের জঙ্গলের মধ্যে, ওদের শাস্তি না হলে আমি যে শান্তিতে যেতেও পারছি না বাবা। কিট্টু কি কাঁদছিল কথা বলতে বলতে, আমার চোখ দিয়ে অনবরত জল পড়ছিল কেনো তবে?"
মামার চোখ বড় বড় হয়ে গেল।তারপর আমি বাবা বলে একটা জোর চিৎকার করে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলাম।
যখন জ্ঞান ফিরল, তখন পরের দিন দুপুর গড়িয়ে বিকেল। শরীর ব্যথায় ভরা। ঘটনাগুলো কি সত্যি ঘটেছে? নাকি দুঃস্বপ্ন? মা আর দিদা দেখি মাথার কাছে বসে আছে।
কিন্তু বাইরে খুব হৈচৈ। পুলিশ এসেছে। আমি টলতে টলতে উঠে গেলাম বাইরে, আমাকে সব জানতে ই হবে।
মামা কাঁদতে কাঁদতে বললেন—“তুই যা বলেছিস সব ঠিক… লাঠিটা সত্যিই ওখানে পাওয়া গেছে। হাতের ছাপও পাওয়া গেছে, দোষীরা ধরা পড়বে পুলিশ বলেছে"
@কলমে প্রিয়াঙ্কা
মামা হাঁটু গেড়ে বসে কাঁদতে লাগলেন, “কিট্টু কাল সত্যিই তোর কাছে এসেছিল রে…”
আমি জানালা দিয়ে ঘরটার দিকে তাকালাম—
কিট্টুর ঘরটা এখন ফাঁকা। তবু মনে হল, ঘরটায় এক অদ্ভুত শান্তি বিরাজ করছে—
কিন্তু আমি আজও ওই ঘরের সেই কোন টার দিকে তাকাতে পারি না…
কারণ আমি জানি—
সেদিন রাতে সে সত্যিই আমার ঘরে বসেছিল।
সে আমার ভাই ; কিন্তু মানুষ না।।
@কলমে প্রিয়াঙ্কা
Priyanka Sarkar Suman Sarkar ্মৃতিতে